নিবন্ধন নেই, চালকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও নেই। এরপরও বগুড়ার শেরপুরে মহাসড়কজুড়ে অবাধে চলছে তিন হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও থ্রি-হুইলার। গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও ইউটার্নে অনেক সময় উল্টো পথে এসে এসব যান মহাসড়ক পার হচ্ছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদেরও এসব যান চালাতে দেখা যাচ্ছে। দ্রুতগতির বাস-ট্রাকের সঙ্গে ধীরগতির অটোরিকশার চলাচলে তৈরি হচ্ছে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) শেরপুর শহরের ধুনট মোড়, বাসস্ট্যান্ড, উপজেলা মোড় ও কলেজ রোড এলাকায় সরেজমিনে অটোরিকশার ব্যাপক চলাচল দেখা যায়। ধুনট মোড় ও উপজেলা মোড়ের গুরুত্বপূর্ণ ইউটার্নে বিপরীত দিক থেকে এসে অটোরিকশাকে মহাসড়ক পার হতে দেখা গেছে। এতে যান চলাচলে বিঘ্নের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
স্থানীয় বাসিন্দা শামিম বলেন, ধুনট মোড় ও উপজেলা মোড় মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ দুটি ইউটার্ন। ছোট যানবাহনের জন্য আলাদা লেন না থাকায় অটোরিকশাগুলো অনেক সময় উল্টো দিক দিয়ে এসে সড়ক পার হয়। এতে যানজট তৈরি হয়। শিক্ষার্থী ও পথচারীদেরও ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়ক পার হতে হয়। কখনো অ্যাম্বুলেন্সও যানজটে আটকে পড়ে।
শেরপুর শহর রিকশা, ভ্যান ও অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন সমিতির সেক্রেটারি মাহমুদুল হাসান (লিটন) বলেন, শেরপুর শহরে তিন হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও থ্রি-হুইলার রয়েছে। তাঁদের বেশির ভাগ চালকের প্রশিক্ষণ নেই। তাঁরা সড়কের নিয়মকানুনও ভালোভাবে জানেন না। এ কারণে সড়কে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, হঠাৎ করে কেউ যেন রাস্তায় না নামে, সে জন্য বিভিন্ন পয়েন্টে গিয়ে প্রকৃত চালকদের কার্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তাঁরা চান, অটোরিকশাগুলো শৃঙ্খলার মধ্যে চলুক।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শেরপুরে পর্যাপ্ত গণপরিবহন না থাকায় স্বল্প দূরত্বে চলাচলের ক্ষেত্রে অটোরিকশার ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। অন্য কাজের তুলনায় অটোরিকশা চালানো সহজ হওয়ায় অনেকেই এ পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে অটোরিকশার সংখ্যা।
এসব যান মহাসড়কে চলাচল করায় দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের স্বাভাবিক গতিও ব্যাহত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। উল্টো পথে চলাচল, হঠাৎ সড়ক পারাপার ও অনিয়ন্ত্রিত ইউটার্ন নেওয়ার কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিয়ম অনুযায়ী, সড়কে বৈধভাবে যানবাহন চালাতে প্রয়োজনীয় নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ, বীমা ও চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র থাকা প্রয়োজন। তবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিবন্ধনের আওতার বাইরে থাকায় এসব যানবাহনের ক্ষেত্রে প্রচলিত রাজস্ব কাঠামো কার্যকর নয়। ফলে এ খাত থেকে সরকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে সারাদেশে থ্রি-হুইলার দুর্ঘটনায় ৭৮ জন যাত্রী নিহত হয়েছেন। একক জেলা হিসেবে বগুড়ায় সর্বোচ্চ ৩৭ জন নিহত হন। জুলাইয়ে ১৩১টি থ্রি-হুইলার দুর্ঘটনায় ৯৪ জন এবং জুনে ১১২ জন যাত্রী নিহত হন।
শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আইয়ুব আলী বলেন, যানজট নিরসনে হাইওয়ে পুলিশ তৎপর রয়েছে। অটোরিকশা ও সিএনজি সার্ভিস লেন দিয়ে চলাচল করতে পারবে। তবে অনেক জায়গায় সার্ভিস লেন না থাকায় এসব যান মূল সড়কে উঠে আসে। মহাসড়কের অটোরিকশা স্ট্যান্ডগুলোতে মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করা হয়। উপজেলা ও ধুনট ইউটার্নে নিয়মিত ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে।
শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, শেরপুর শহর জনবহুল এলাকা। এখানে প্রচুর অটোরিকশা চলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উল্টো পথে চলাচল ও নিয়ম না মানার কারণে যানজট সৃষ্টি হয়। বিষয়টি হাইওয়ে পুলিশকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে বলা হবে। শৃঙ্খলা ফেরাতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।
বগুড়া শহরের যানজট কমাতে অটোরিকশা লাল ও সবুজ দুই রঙে ভাগ করে এক দিন পরপর চলাচলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শেরপুরেও এ ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, এটি ভালো উদ্যোগ। শেরপুরে তা বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
উল্লেখ্য, গত ৮ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন ও সেতু, নৌপরিবহন এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রাবিউল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, জাতীয় মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচলের কোনো আইনি সুযোগ নেই। এসব যানবাহনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান এবং শৃঙ্খলিত ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।