
স্টাফ
রিপোর্টার
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ - ১৬:২৬
• পঠিত: ৪ বার

মানুষের জীবনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অনুভূতিগুলোর একটি হলো প্রিয় স্বজনের সান্নিধ্য। সেই স্বজন যখন চিরদিনের জন্য চলে যান, তখন তাঁর শূন্যতা কতটা গভীর, কতটা অসহনীয়—যে হারায়, সে ছাড়া আর কেউ তা পুরোপুরি বুঝতে পারে না। প্রিয় মানুষটির মুখটি আর দেখা যাবে না, কণ্ঠটি আর শোনা যাবে না, ফিরে আসবে না সেই পরিচিত ডাক। তখন তাঁর স্মৃতি আঁকড়ে ধরেই বেঁচে থাকতে চায় স্বজনেরা।
আর তাই মৃত্যুর পর প্রিয় মানুষটিকে কোথায় শেষ ঠিকানায় শায়িত করা হবে, সেটিও পরিবারের কাছে হয়ে ওঠে অত্যন্ত আবেগের বিষয়। কোথায় দাফন করলে স্বজনেরা সহজে যেতে পারবেন, কবরটি কত দিন অক্ষত থাকবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেখানে গিয়ে প্রিয় মানুষটির জন্য দোয়া করতে পারবে কি না—এসব নিয়ে চলে চুলচেরা হিসাব-নিকাশ।
রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারী মানুষের বড় একটি অংশ চান, প্রিয়জনের শেষ ঠিকানাটিও থাকুক এই শহরেই। কারণ এখানেই তাঁদের জীবন, কর্ম, সন্তান-স্বজন, পরিচিতজন। গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গেলে হয়তো নিয়মিত কবর জিয়ারত করা সম্ভব হবে না। তাই কবরের জায়গা কত দিন থাকবে, কত টাকা লাগবে—এসব জেনেও অনেকে ঢাকাতেই দাফন করেন স্বজনকে। অথচ তাঁরা জানেন, কয়েক বছর পর হয়তো সেই কবরের মাটি সমান করে সেখানে শায়িত করা হবে সম্পূর্ণ অচেনা আরেকজনকে।
জীবিত মানুষের আবাসন সংকটের কথা রাজধানী ঢাকায় প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যে মৃত মানুষের শেষ ঠিকানার সংকটও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, সে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম। প্রায় তিন কোটি মানুষের এই নগরীতে সরকারি কবরস্থানের মোট জমি মাত্র ২৫৩ একর। ফলে মৃত্যুর পরও মানুষের শেষ ঠিকানাটুকু নিশ্চিত নয়।
আর সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই কবর সংরক্ষণকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অর্থের আরেক বাস্তবতা। দাফনের পর কবরের চিহ্ন ধরে রাখতে কোথাও পদে পদে দিতে হয় টাকা, কোথাও মাসে মাসে গুনতে হয় নির্দিষ্ট অর্থ। আর দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণ করতে চাইলে গুনতে হয় লাখ থেকে কোটি টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাত্র ২৫ বছরের জন্য একটি সাড়ে তিন হাত জায়গা সংরক্ষণে ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৪ কোটি টাকা—যে অর্থে রাজধানীর গুলশান-ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট কিংবা জমি কেনার কথাও ভাবা যায়।
একদিকে শোকাহত স্বজনের চোখে প্রিয় মানুষটির শেষ ঠিকানাটি অমূল্য; অন্যদিকে সেই শেষ ঠিকানার মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে টাকার অঙ্কে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—মৃত্যুর পর মানুষের শেষ আশ্রয়ও কি সামর্থ্যের মাপকাঠিতে নির্ধারিত হবে? প্রিয় স্বজনের কবরটুকু ধরে রাখার অধিকার কি শুধু অর্থবান মানুষের জন্যই?
রাজধানী ঢাকায় জীবিত মানুষের আবাসন সংকটের কথা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সংকট বাড়ছে মৃত মানুষের শেষ ঠিকানা নিয়েও। প্রায় তিন কোটি মানুষের এই নগরীতে সরকারি কবরস্থান মাত্র ১৩টি। এসব কবরস্থানের মোট জমির পরিমাণ ২৫৩ একর। সব মিলিয়ে দাফন সক্ষমতা ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭৮ জনের। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায় কবরস্থানের জমি ১৯২ একর, আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতায় মাত্র ৬১ একর।
জনসংখ্যার তুলনায় কবরস্থানের এই অপ্রতুলতা রাজধানীর শেষবিদায়ের ব্যবস্থাপনাকে ক্রমেই জটিল করে তুলছে। জায়গার সংকটে পুরনো কবর পুনর্ব্যবহার এখন অনেক কবরস্থানের নিয়মিত বাস্তবতা। কোথাও দুই বছর পর একই স্থানে নতুন মরদেহ দাফন করা হচ্ছে, কোথাও স্বজনেরা কবরের চিহ্ন ধরে রাখতে মাসে মাসে টাকা দিচ্ছেন। আবার সামর্থ্যবানদের জন্য কোনো কোনো কবর ১৫ বা ২৫ বছর সংরক্ষণের সুযোগ থাকলেও এর জন্য গুনতে হচ্ছে লাখ থেকে কোটি টাকা।
ফলে জীবনের শেষ ঠিকানাতেও তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত বৈষম্য—অর্থ থাকলে কবর দীর্ঘদিন সংরক্ষণের সুযোগ, আর সামর্থ্য না থাকলে স্বজনের কবরের অস্তিত্বই অল্প সময়ের মধ্যে মুছে যাওয়ার আশঙ্কা।
সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার সরকারি ১৩টি কবরস্থানে মোট জমি ২৫৩ একর। এর মধ্যে ডিএনসিসির ১৯২ একর এবং ডিএসসিসির ৬১ একর। এসব কবরস্থানে সম্মিলিত দাফন সক্ষমতা ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭৮ জন।
ঢাকার বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় এই জায়গা যে অত্যন্ত সীমিত, তা সহজেই বোঝা যায়। প্রতিদিন নগরীতে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। অথচ নতুন কবরের জন্য জমির পরিমাণ বাড়ছে না একই অনুপাতে। ফলে পুরনো কবর পুনর্ব্যবহারই হয়ে উঠেছে অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত একমাত্র ব্যবস্থা।
কিন্তু এই বাস্তবতা তৈরি করছে স্বজনদের জন্য নতুন সংকট। প্রিয়জনকে দাফনের পর তাঁরা জানেন, নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলে সেই কবর আর আগের অবস্থায় নাও থাকতে পারে। ফলে শোকের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অনিশ্চয়তা—কত দিন থাকবে প্রিয় মানুষের শেষ ঠিকানা?
রাজধানীর বিভিন্ন কবরস্থানে সাধারণ কবরের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জায়গা ব্যবহারের বিধান রয়েছে। জায়গার সংকটের কারণে নির্ধারিত সময় শেষ হলে পুরনো কবরের জায়গায় নতুন মরদেহ দাফন করা হয়।
বিশেষ করে বনানী কবরস্থানে এই সংকট প্রকট। সেখানে ৯ হাজারের বেশি কবর রয়েছে এবং নতুন দাফনের জায়গা সংকুচিত হয়ে এসেছে। ফলে সাধারণ কবর দুই বছর পর পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ কবিতার সেই আবেগময় দৃশ্য—‘এই খানে তোর দাদির কবর’—রাজধানীর অধিকাংশ সাধারণ পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
কারণ একটি কবরের সঙ্গে শুধু একজন মৃত মানুষের স্মৃতি নয়, জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের ইতিহাস, সম্পর্ক ও আবেগ। কিন্তু জায়গার সংকট সেই স্মৃতিকে স্থায়ী করার সুযোগ ক্রমেই সীমিত করছে।
অর্থ থাকলে অবশ্য কবর দীর্ঘ সময়ের জন্য সংরক্ষণ করার সুযোগ রয়েছে। ডিএনসিসির কবরস্থান নীতিমালা অনুযায়ী, বনানী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণে দিতে হয় ১ কোটি টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য দেড় কোটি টাকা।
উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে এই হার যথাক্রমে ৭৫ লাখ ও ১ কোটি টাকা। উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে ১৫ বছরের জন্য ৫০ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ৭৫ লাখ টাকা। উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে ৩০ লাখ ও ৫০ লাখ টাকা।
মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য ২০ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ৩০ লাখ টাকা। রায়েরবাজার বধ্যভূমিসংলগ্ন কবরস্থানে একই মেয়াদের জন্য দিতে হয় ১০ লাখ ও ১৫ লাখ টাকা।
তবে বাস্তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফির চেয়ে ব্যয় আরও বেশি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বনানী কবরস্থানে ২৫ বছরের জন্য একটি কবর সংরক্ষণে মোট ব্যয় সাড়ে চার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ একজন স্বজনের কবর দীর্ঘ সময় ধরে রাখার ইচ্ছা থাকলেও সেটি সবার জন্য সমানভাবে বাস্তবায়নযোগ্য নয়।
কবরস্থানের জায়গা সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দাফন ও কবর সংরক্ষণকে ঘিরে বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম মারা গেলে তাঁকে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরিবারের একজন স্বজনের অভিযোগ অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত দাফন ফি ছিল ১ হাজার টাকা। কিন্তু দাফন সম্পন্ন করতে তাঁদের মোটামুটি ১০ হাজার টাকা ব্যয় হয়।
এর বাইরে কাঠের নামফলকের জন্য ৩০০ টাকা, কবর সাজানো ও সাময়িক সংরক্ষণের নামে এককালীন আরও ১ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এরপর কবরটি অক্ষত রাখার জন্য মাসে ৫০০ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়।
পরিবারটির আশঙ্কা ছিল, মাসিক টাকা দেওয়া বন্ধ করলে কবরের মাটি সমান করে সেখানে অন্য মরদেহ দাফন করা হতে পারে।
অর্থাৎ একজন মানুষকে দাফনের পরও স্বজনদের আর্থিক দায় শেষ হচ্ছে না—কবরের চিহ্ন ধরে রাখতেও তাঁদের নিয়মিত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কবরস্থানগুলোতে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও খাটোলি থাকলেও কোনো কোনো কবরস্থানে এর বাইরে বিপুলসংখ্যক অনানুষ্ঠানিক কর্মী সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের ‘সহায়ক কর্মী’ পরিচয় দিয়ে এসব ব্যক্তি দাফন, কবর সাজানো, বাঁশের বেড়া দেওয়া, ঘাস লাগানো, পানি দেওয়া ও নিয়মিত পরিচর্যার কাজ করেন।
বাঁশের বেড়া দিতে ২ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা, কবর সাজানো বা ঘাস লাগাতে প্রায় ১ হাজার টাকা এবং নিয়মিত পানি দেওয়া ও দেখভালের জন্য মাসে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এসব অর্থ নেওয়ার সঙ্গে সিটি করপোরেশনের আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
রায়েরবাজার কবরস্থানে দীর্ঘদিন কাজ করা এক কর্মী স্বজনদের কাছ থেকে এ ধরনের অর্থ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এ আয়ের একটি অংশ সিটি করপোরেশনের অসাধু কর্মীদের কাছেও যায়। তবে এ অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ‘কবরস্থানগুলোর নীতিমালা-২০২২’-এ সাধারণ এলাকার কবরের ওপর বাঁশ, ইট, লোহার গ্রিল বা অন্য কোনো উপায়ে স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি কিংবা বেড়া দেওয়ার সুযোগ নেই।
অথচ বাস্তবে কবর ঘিরে বাঁশের বেড়া, সাজসজ্জা ও পরিচর্যার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে—নীতিমালায় যদি এসব কাজের অনুমোদন না থাকে, তাহলে কবরস্থানের ভেতরে কীভাবে এসব কার্যক্রম চলছে? কারা এসব অর্থ নিচ্ছে? আর স্বজনেরা অভিযোগ করার পরও কেন তা বন্ধ হচ্ছে না?
জায়গার সংকটের কারণে সংরক্ষিত কবরেও পরিবারের একাধিক সদস্যকে দাফনের নজির রয়েছে। কোনো কোনো কবরে সাতজন পর্যন্ত দাফন করা হয়েছে।
তবে পুনর্দাফনের সুযোগও সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। নীতিমালা অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির ছেলে-মেয়ে, স্বামী বা স্ত্রী, বাবা-মা এবং ভাই-বোনের মধ্যে এ সুযোগ সীমিত রাখা হয়েছে।
এ ব্যবস্থাও দেখিয়ে দেয়, রাজধানীর কবরস্থানগুলোতে জায়গার সংকট কতটা গভীর হয়ে উঠেছে।
কবরের জায়গার সংকট ও সংরক্ষণ ব্যয়ের বর্তমান চিত্র আরও স্পষ্ট হয় পুরনো নথির সঙ্গে তুলনা করলে।
তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালে বনানী ও উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে স্থায়ীভাবে কবরের জায়গা কিনতে খরচ হতো ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে জায়গা পাওয়া যেত ২৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকায়।
২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী কবরের জায়গা কেনা বন্ধ রাখা হয়। এরপর ২০০৮ সাল থেকে মেয়াদভিত্তিক কবর সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু হয়।
২০২৩ সালে সংরক্ষণ ফি বাড়ানোর আগে বনানীতে ১৫ বছরের জন্য সর্বোচ্চ ফি ছিল ২৪ লাখ টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য ৪৫ লাখ টাকা। পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।
ডিএনসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন-উল-হাসান বলেছেন, সাধারণভাবে কবর দেওয়ার খরচ বাড়ানো হয়নি। দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণে উচ্চ ফি নির্ধারণের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে সংরক্ষণে নিরুৎসাহিত করা, যাতে সবাই কবর সংরক্ষণ করতে চাইলে ঢাকায় কবরের জায়গার সংকট আরও বাড়ে।
সিটি করপোরেশনের এই ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট যে, কবরস্থানের জায়গা সংকটই দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ সীমিত রাখার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—একদিকে জায়গার সংকট, অন্যদিকে বিপুল অর্থের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের সুযোগ—এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়সংগত ও মানবিক সমাধান কোথায়?
ঢাকার কবরস্থান ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এখানেই।
একজন নিম্ন বা মধ্যম আয়ের মানুষ প্রিয়জনের কবরটি কয়েক বছর ধরে রাখতে মাসে কয়েকশ টাকা করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে সামর্থ্যবান কেউ একই কবর ১৫ বা ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতে লাখ কিংবা কোটি টাকা ব্যয় করতে পারছেন।
ফলে একই শহরে মৃত্যুর পরও অর্থনৈতিক সক্ষমতা মানুষের শেষ ঠিকানার স্থায়িত্বে প্রভাব ফেলছে—এমন অভিযোগ ও বাস্তবতা সামনে আসছে।
উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা আবু রায়হানের অভিজ্ঞতাও এর উদাহরণ। তাঁর খালু আব্দুল আলী মারা যাওয়ার পর ঢাকায় দাফনের ইচ্ছা থাকলেও কবর সংরক্ষণের বিপুল ব্যয় বহন করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।
রাজধানীতে কবরস্থানের জমি ২৫৩ একর, আর জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি—এই বৈপরীত্যই পুরো সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন নতুন মরদেহের জন্য জায়গা প্রয়োজন, কিন্তু নতুন কবরস্থানের জমি সেই অনুপাতে বাড়ছে না।
ফলে পুরনো কবর পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণে বিপুল অর্থ নির্ধারণ করা হচ্ছে। আর এর বাইরে কবর পরিচর্যা, বেড়া, নামফলক ও অন্যান্য কাজের নামে অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
অর্থাৎ কবরস্থানের জায়গা সংকট শুধু জমির সংকট নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, অনিয়ম এবং স্বজনদের আবেগকে ঘিরে নানা ধরনের আর্থিক চাপ।
ঢাকার মতো দ্রুত সম্প্রসারিত মহানগরে কবরস্থানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি। জনসংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন কবরস্থান স্থাপন, বিদ্যমান কবরস্থানগুলোর আধুনিক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং দাফন ও সংরক্ষণ ফি সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কবরস্থানে অননুমোদিত অর্থ আদায় বন্ধে কার্যকর নজরদারি এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
কবর মানুষের জীবনের শেষ ঠিকানা। সেখানে অর্থের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও সাধারণ মানুষের জন্য যেন প্রিয়জনের কবরটুকু ধরে রাখাই অসম্ভব না হয়ে পড়ে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
রাজধানীর ১৩টি সরকারি কবরস্থানের ২৫৩ একর জমি দিয়ে প্রায় তিন কোটি মানুষের শেষ ঠিকানার চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়—এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই শুধু পুরনো কবর পুনর্ব্যবহার কিংবা সংরক্ষণ ফি বাড়িয়ে সংকট সামাল দেওয়ার বদলে প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, স্বচ্ছ ও মানবিক কবরস্থান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা।
কারণ জীবনের শেষ মুহূর্তে মানুষ অর্থ, পরিচয় কিংবা ক্ষমতা নিয়ে যায় না। থেকে যায় শুধু একটি নাম, কিছু স্মৃতি এবং কয়েক হাত মাটির একটি কবর। সেই শেষ ঠিকানাটুকু যেন কারও কাছে ব্যবসার সুযোগ আর কারও কাছে অসহায়তার কারণ না হয়—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
